ডালুছাড়া চা বাগানের চা শ্রমিকদের মুজরি এখনও ৯৯

বিশেষ প্রতিবেদক
  • Update Time : বুধবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৩
  • ৪৪ Time View

চা শ্রমিক ডটকমঃ ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদান করা না হলে বাগান বন্ধ করে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে- চা-শ্রমিকের ১০ দফা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি সহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার আদায়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা চত্ত্বরে আজ সকাল ১১ টায় চা-শ্রমিকের ১০ দফা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি, ডালুছড়া চা-বাগানের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ডালুছড়া চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি এবং চা-শ্রমিকের ১০ দফা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য শ্রমিকনেতা বর্মা মৃধার সভাপতিত্বে এবং সংগঠক মনীষা ওয়াহিদের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন চা-শ্রমিকের ১০ দফা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এস এম শুভ, কেন্দ্রীয় সদস্য ও মোমিনছড়া চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি লিটন মৃধা, ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিক রীতা মৃধা, আরতি বাউরি, সুবল বাউরি এবং শ্রীমতী কুর্মি।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের সব চা-বাগানে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা হলেও ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের মজুরি এখনো মাত্র ৯৯ টাকা। ইতিপূর্বে যখন মজুরি ছিল ১২০ টাকা, ১০২ টাকা তখনও শ্রমিকদের ৯৯ টাকা মজুরি দেয়া হত। বাগান মালিক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দিয়ে বছরের পর বছর ঠকিয়ে যাচ্ছেন। বাগানের শ্রমিকরা আজ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, অন্যান্য বাগানে সপ্তাহে ৭ দিনের মজুরি দেয়া হলেও ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের দেয়া হয় ৬ দিনের মজুরি। শ্রমিকদের কোন রেশন দেয়া হয় না। শ্রমিকরা রেশনের দাবি করলে ম্যানেজমেন্ট চাষের অযোগ্য জমিতে চাষ করতে বলেন। শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য ন্যূনতম কোন ব্যবস্থা রাখেন নি বাগান মালিক। চিকিৎসক নেই, ধাত্রী নেই। কেউ অসুস্থ হলে বাইরে চিকিৎসা নিতে হয় শ্রমিকদের, কিন্তু শ্রমিকদের চিকিৎসার খরচ বহন করার মত আর্থিক সামর্থ্যও নেই। ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য প্রতি বছর বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও শ্রমিকদের কিছুই দেয়া হয় না। শ্রমিকদের আর্থিক সংগতি না থাকায় সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছেন না। বাগান সম্প্রসারণের উদ্যোগ না থাকায় নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয় না, বিধায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
সভাপতির বক্তব্যে শ্রমিকনেতা বর্মা মৃধা বলেন, যদি ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি অবিলম্বে দেয়া না হয় তাহলে বাগান বন্ধ রেখে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ডালুছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদান ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।
সমাবেশ শেষে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডালুছড়া চা-বাগানের মালিকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন আছে বলে উপস্থিত শ্রমিকদের অবহিত করেন। পরবর্তীতে সিলেটের জেলা প্রশাসক, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট স্মারকলিপির অনুলিপি প্রদান করা হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

চা শ্রমিক ডটকমঃ চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়েছে চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। চা শিল্পে উৎপানদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রমিক-মালিকদের ঐক্য এবং সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছে সংগঠনটি।

সোমবার (২৯ আগস্ট) বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এম শাহ আলম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি এ শিল্পের প্রকৃত চিত্রও তুলে ধরা হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি চা শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্বির লক্ষ্যেই শ্রীমঙ্গলে চা গবেষণা ইনিস্টিটিউটে স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে চা শিল্পেই সুদূরপ্রসারী উন্নয়নের যাত্রা ও সার্বিক বিকাশের পথ উন্মোচন করেন। তিনি ১৯৭২ সালে রব কমিশন গঠন করে চা শিল্পের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭২-৭৪ সালে চা বাগানের বিধ্বস্ত কারখানা চালু করার লক্ষ্যেই ভারত থেকে আইডিবিআই ঋণের ব্যবস্থা করে চা শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান এম শাহ আলম। তিনি টি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।

বিটিএর পক্ষ থেকে ওই সভায় জানানো হয়, দেশে চা একটি কল্যাণমূলক শিল্পের আদর্শ হিসেবে দেড় শতাব্দীর অধিক সময় ধরে গড়ে উঠেছে। এ শিল্পে নিয়োজিত একজন শ্রমিক নগদ মজুরি এবং দ্রব্য ও অনগদ পারিশ্রমিক বাবদ মজুরি পেয়ে থাকেন, যার পরিমাণ মজুরির নগদ অংশের দ্বিগুণের বেশি। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নারীদের অধিকার ও সম্মান প্রদানে চা শিল্পই প্রথম পদক্ষেপ নেয়। ১৬৮ বছরের পুরোনো শিল্প হিসেবে বাংলাদেশের অন্যান্য যেকোনো শিল্পের তুলনায় অনেক আগে থেকেই শ্রম আইন অনুসরণপূর্বক ১৯৭০ দশকে লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ এর মাধ্যমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমকাজের জন্য সমমজুরি নিশ্চিত করেছে।

চা শিল্পে ১৯৩৯ সাল থেকে শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রচলন করা হয় এবং মাতৃকালীন ছুটি ও আইন নির্ধারিত মাতৃত্বকালীন ভাতা দিয়ে থাকে। চা বাগানগুলো গর্ভ ও প্রসবকালীন জটিলতাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে, যা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য শিল্পে বিরল। সর্বোপরি, সবদিক থেকেই চা শিল্প অনেক আগে থেকে সুসংগঠিত একটি শিল্প।

চা শিল্পে প্রতি শ্রমিককে ২ টাকা কেজি দরে মাসে গড়ে প্রায় ৪২ কেজি চাল রেশন হিসেবে দেওয়া হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩১০ টাকা অথবা সমপরিমান আটা দেওয়া হয়। তাছাড়া, শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে চা শিল্পে প্রায় ৯৪ হাজার ২০০ বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য চা শ্রমিকদের দেওয়া হয়েছে।

চা শ্রমিক ও তার পুরো পরিবারের সবাই বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। অথচ অন্যান্য শিল্পে শুধু শ্রমিকরা এ সুবিধা পান। শ্রমিকদের মৃত্যুর পরেও তার পরিবারের জন্য এ সুবিধা বহাল থাকে।
উল্লেখ্য যে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চা শিল্পে দুটি বড় আকারের আধুনিক গ্রুপ হাসপাতাল ও ৮৪টি গার্ডেন হাসপাতালে ৭২১ শয্যার ব্যবস্থা, ১৫৫টি ডিসপেনসারিসহ মোট ৮৯০ জনের অধিক মেডিকেল স্টাফ নিয়োজিত আছেন।

চা শ্রমিকের সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক, জুনিয়র ও উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট ৭৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে ১ হাজার ২৩২ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। বর্তমানে ৪৪ হাজার ৮০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

চা শ্রমিকদের বসতবাড়ির জন্য বিনামূল্যে পরিবার প্রতি ন্যূনতম ১ হাজার ৫৫১ স্কয়ার ফিট জায়গায় দুটি থাকার ঘর, রান্নঘর এবং ল্যাট্রিনসহ বসতবাড়ি বাগানমালিক নির্মাণ করে দেয়। মোট ৫ হাজার ৮০০ বিঘা জমি শ্রমিকদের বসতবাড়ির জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া, গবাদি পশু পালনের জন্য চারণভূমি ও রাখালের খরচও বাগানমালিক বহন করে থাকেন।

একজন চা শ্রমিক অবসর গ্রহণ করলে তার পরিবর্তে তার পছন্দ অনুযায়ী পরিবারের একজনকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা অবসরভাতা পেয়ে থাকেন এবং ২ টাকা কেজি দরে চাল বা আটা পেয়ে থাকেন। এক হিসাবে দেখা যায় যে, দৈনিক ১৭০ টাকা নগদ মজুরি হলে তার সাথে দ্রব্য ও অনগদ পারিশ্রমিক মিলে মোট মজুরি গড়ে দৈনিক প্রায় ৫৪০ টাকা হয়।

উল্লেখ্য, বর্তমানে চায়ের গড় নিলাম মূল্য ২০২ টাকা এবং উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০০ টাকা। চা চাষের বহু উপাদানের মূল্য বহু পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১০ বছরে চায়ের নিলাম মূল্য প্রতি কেজিতে ০.১৬% , শ্রমিক মজুরি ৭৩.৯১ % এবং উৎপাদন ব্যয় ৪৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ অবস্থায় চা শিল্পে উৎপানদনশীলতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে শ্রমিক-মালিককে একসাথে কাজ করতে হবে এবং সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রয়োজন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এ আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রতি সম্মান রেখে বাগানমালিকগণ ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যকার সুদীর্ঘ দ্বিপাক্ষিক বিদ্যমান সুসম্পর্ক চা শিল্পের উন্নয়নের ধারা অক্ষুণ্ন রেখে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখাসহ জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাচীনতম এ শিল্পের অবদান অব্যাহত থাকবে।

চা শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে যা বলছে টি অ্যাসোসিয়েশন-